এস এম মালিকুল ইসলাম:——— জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার যখন বদ্ধপরিকর, ঠিক তখনই ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া মোড় এলাকায় কিছু অসাধু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করেছে র্যাব-১৪। আজ সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত র্যাব-১৪ এর সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট-এর নেতৃত্বে এই মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযান অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, জনস্বাস্থ্যের সাথে কোনো আপস নয়।
দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ আসছিল যে, ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া মোড় এলাকায় অবস্থিত কিছু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মাবলী উপেক্ষা করে অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মানহীন চিকিৎসা সেবা, অনুমোদনহীন কার্যক্রম, অপ্রশিক্ষিত কর্মী দ্বারা স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অতিরিক্ত ফি আদায়ের মতো বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার নিশ্চিতকরণে র্যাব-১৪ এই অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়।
অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল:
* অবৈধভাবে পরিচালিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো চিহ্নিত করা।
* স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনবিহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
* চিকিৎসা সেবার মান নিশ্চিত করা এবং রোগীদের অধিকার সুরক্ষা করা।
* অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
* রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায়ের মতো অনিয়ম বন্ধ করা।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট-এর নেতৃত্বে র্যাব-১৪ এর একটি দল চরপাড়া মোড় এলাকার বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আকস্মিক অভিযান চালায়। অভিযানকালে, কর্মকর্তারা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, পরিবেশ, চিকিৎসক ও নার্সদের যোগ্যতা, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মান এবং ওষুধের মজুদ পরীক্ষা করেন।
অভিযান চলাকালে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গুরুতর অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ধরা পড়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:
* অনেক প্রতিষ্ঠানেরই প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছিল না অথবা লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
* কিছু প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে, ডিপ্লোমাধারী নার্সের পরিবর্তে অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা নার্সের দায়িত্ব পালন করছেন।
* পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, অপারেশন থিয়েটারের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করার অভিযোগও পাওয়া যায়।
* বেশ কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দেখা গেছে, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে টেস্ট করা হচ্ছে, যা ফলাফলের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিকভাবে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় এবং কিছু প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়লে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
এই অভিযান ময়মনসিংহ জেলার সকল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা বহন করে। প্রশাসন জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করতে প্রস্তুত নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সকল নীতিমালা ও নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে।
* লাইসেন্স ও অনুমোদন:– সকল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে অবশ্যই বৈধ লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে।
* যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল:– চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী অবশ্যই সরকার কর্তৃক স্বীকৃত যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে।
* পরিচ্ছন্ন পরিবেশ:– প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
* মানসম্মত যন্ত্রপাতি:–রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত সকল যন্ত্রপাতি আধুনিক ও কার্যকরী হতে হবে এবং নিয়মিতCalibration করাতে হবে।
* ন্যায্য ফি:–রোগীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত বা যুক্তিসঙ্গত ফি আদায় করতে হবে, কোনোভাবেই অতিরিক্ত ফি আদায় করা যাবে না।
* নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা:–সেবার ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে, যাতে রোগীরা সঠিক ও বিশ্বস্ত সেবা পান।
জনসাধারণকে অনুরোধ করা হচ্ছে, যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও সেবার মান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বা দুর্নীতি পরিলক্ষিত হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন। আপনার সচেতনতা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই অভিযান কেবল একটি শুরু। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে র্যাব-১৪, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রশাসনের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিচ্ছবি।
Leave a Reply